সুনামগঞ্জে নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ এখনও শুরু হয়নি। গত ১৫ ডিসেম্বর নিয়মরক্ষার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হলেও তারপর পেরিয়ে গেছে ২২ দিন। অথচ, মাঠপর্যায়ে কাজ শুরুর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি চোখে পড়ে না।
হাওর থেকে পানি নামতে দেরি হওয়ায় কাজ শুরু করতে দেরি হচ্ছে—সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এমন দাবি করলেও কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতারা বলছেন ভিন্ন বাস্তবতার কথা।
রবিবার (৪ জানুয়ারি) তাহিরপুর, ধর্মপাশা ও জামালগঞ্জ উপজেলার একাধিক হাওর ঘুরে দেখা যায়, বাঁধের ভাঙা অংশ বন্ধ করা ও মেরামতের জন্য হাওরের অধিকাংশ এলাকাই কাজ শুরুর উপযোগী অবস্থায় রয়েছে। ধর্মপাশা উপজেলার সোনামড়ল হাওরের একাংশ এবং তাহিরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলার হালি, শনি ও মহালিয়া হাওরের প্রায় অর্ধশত প্রকল্প এলাকায় কাজ শুরুর কোনো প্রস্তুতি চোখে পড়েনি। যদিও এসব হাওরের কয়েকটি অংশ দিয়ে পানি নামছে, তবে প্রাক্কলিত বাঁধের অধিকাংশ স্থানেই কাজ করার মতো পরিবেশ বিরাজ করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) অধ্যুষিত শাল্লা ও ধর্মপাশা ছাড়াও মধ্যনগর, তাহিরপুর, দিরাই ও শান্তিগঞ্জসহ একাধিক উপজেলায় এখনও বাঁধের কাজ শুরু হয়নি। কোথাও কোথাও এখনো পিআইসি গঠন প্রক্রিয়াই শেষ হয়নি। এতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতারা।
নীতিমালা অনুযায়ী, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পিআইসি গঠন, ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শুরু এবং ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ শেষ করার কথা। কিন্তু কাজ শুরু তো দূরের কথা, অনেক উপজেলায় এখনো পিআইসি গঠনই শেষ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এতে কৃষকসহ হাওরাঞ্চলের সচেতন মানুষের মাঝে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, জেলায় এ বছর প্রায় ৫৩টি হাওরে ৭০২টি পিআইসি গঠন করা হয়েছে। বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৪৫ কোটি টাকা। চলতি মৌসুমে ৫৮৫ কিলোমিটার প্রাক্কলিত বাঁধের মধ্যে ১০৪টি স্থানে ভাঙা অংশ (ক্লোজার) রয়েছে। হাওরের কৃষক ও ফসলের নিরাপত্তায় সরকার প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ দিয়ে আসছে। তবে অন্যান্য বছরের মতো এবারও যথাসময়ে কাজ শুরু না হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তবে পানি নামার কারণে কাজে বিলম্ব হচ্ছে বলে জানিয়েছে পাউবো।
অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল একফসলি এলাকা। বছরে একবারই এখানে বোরো ধান উৎপাদন হয়। এই একমাত্র ফসল উৎপাদন ব্যাহত হলে হাওরাঞ্চলের মানুষের দুর্দশার শেষ থাকে না। এখানকার বোরো ফসল দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সে কারণেই সরকার প্রতি বছর ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে থাকে। কিন্তু গাফিলতির কারণে কাজ পিছিয়ে পড়লে বড় ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা কৃষকদের।
ধর্মপাশা উপজেলার সোনামড়ল হাওরপাড়ের কৃষক চন্দন তালুকদার বলেন, ‘আমরার হাওরে বান্ধের কাজটাজ এখনও শুরু হইছে না। ঠিক টাইমে কাজ করলে মাডি বয় ভালা (বসে ভালো), বাঁনও (বাঁধও) শক্তিশালী হয়। শেষ সময়ে আইয়া তাড়াহুড়া কইরা মাটি কাটব, বাঁন থাকব দুর্বল, পানির ধাক্কা খাইলেই বাঁন ভাইঙা যে শ্রম-ঘাম দিছি সব তলাইয়া যাইব।’
তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওরের দুই পিআইসি সভাপতি সোহেল মিয়া ও নূর মিয়া জানান, বাঁধ নির্মাণের কাজ কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে তারা নিজেরাও নিশ্চিত নন। তাদের ভাষ্য, এখনও বাঁধের কাজের সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। এমনকি নিজেদের পিআইসি নম্বরও তারা জানেন না।
শাল্লা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত সেন বলেন, ‘১৫ ডিসেম্বর উদ্বোধনের পর এখানকার কোনো বাঁধেই এখনও কাজ শুরু হয়নি। ছয়টি হাওরে শতাধিক প্রকল্প রয়েছে। এখনও পিআইসি গঠন প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। পিআইসি নেওয়ার জন্য তদবির চলছে। এ অবস্থায় সময়মতো কাজ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।’
হাওর পরিদর্শন শেষে হাওর বাঁচাও আন্দোলন জামালগঞ্জ উপজেলা সভাপতি রফিকুল বিন বারী বলেন, ‘গত রবিবার হালির হাওর ঘুরেও পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক মনে হয়েছে। কাজ কখন শুরু হবে, কখন শেষ হবে—তা বলা মুশকিল। এভাবে চললে শেষ পর্যন্ত কৃষকরাই বিপদে পড়বে। তখন দৌড়ঝাঁপ করে কোনো লাভ হবে না। সময় থাকতে কাজে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।’
এ বিষয়ে কাবিটা প্রকল্প তদারক কমিটির সভাপতি ও শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, ‘অনেকগুলো বাঁধে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। বেশ কিছু মেশিন হাওরে ঢুকেছে। দু–একদিনের মধ্যেই পুরোপুরি কাজ শুরু হবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, চার-পাঁচটি পিআইসি এখনও গঠন হয়নি। সেগুলো সরেজমিনে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, ‘হাওরের অনেক জায়গা দিয়ে এখনও নদীতে পানি নামছে। পানি নামার কারণেই কাজে বিলম্ব হচ্ছে। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই কাজ শুরু হবে।’